চট্টগ্রাম মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের এবার এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৫৯ দশমিক ৪৮ শতাংশে। সোমবার (১০ আগস্ট) সকালে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড থেকে ঘোষিত ফলাফলে এ তথ্য জানা গেছে। বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক ড. পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী ফলাফল ঘোষণা করেন। বোর্ডের ২০১১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ১৫ বছরের ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এই সময়ে এটাই সর্বনিম্ন পাসের হার। যার ফলে ২০২৬ সালের ফলাফলে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটেছে। এছাড়া চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে ৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাসের হার শূন্য শতাংশ। অর্থাৎ এসব প্রতিষ্ঠান থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া কোনো শিক্ষার্থীই উত্তীর্ণ হতে পারেনি।বোর্ডের প্রকাশিত ‘জিরো পারসেন্টেজ স্কুল’ তালিকায় এসব প্রতিষ্ঠানের নাম উঠে এসেছে।
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক ড. পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী ফলাফল বিপর্যয়ের কারণ হিসেবে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার প্রতি অনাগ্রহের বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। তিনি জানান, পড়াশোনা ছেড়ে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন বিষয়ে আন্দোলনমুখী হয়ে পড়েছে। এর প্রভাব ফলাফলেও পড়েছে।
এদিকে এবার পাসের হার কমে যাওয়ায় এবার বোর্ডে ৫২ হাজার ৭৫৬ জন শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে। একই সঙ্গে গত বছরের তুলনায় জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কমেছে ২ হাজার ৪৪৫ জন। এবার জিপিএ-৫ পেয়েছে ৯ হাজার ৩৯৮ জন। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ১১ হাজার ৮৪৩ জন।
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের গত ১৫ বছরের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত কোনো বছরই পাসের হার ৭৫ শতাংশের নিচে নামেনি। ২০১১ সালে পাসের হার ছিল ৭৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ। ২০১২ সালে ৭৯ শতাংশ, ২০১৩ সালে ৮৮ দশমিক ০৭ শতাংশ, ২০১৪ সালে ৯১ দশমিক ৪২ শতাংশ এবং ২০১৫ সালে ৮২ দশমিক ৮৩ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করে।এছাড়া
২০১৬ সালে পাসের হার ছিল ৯০ দশমিক ৪৬ শতাংশ। ২০১৭ সালে ৮৪ দশমিক ১৩ শতাংশ, ২০১৮ সালে ৭৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ, ২০১৯ সালে ৭৮ দশমিক ১৭ শতাংশ এবং ২০২০ সালে ৮৪ দশমিক ৭৯ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করে।
২০২১ সালে বোর্ডের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৯১ দশমিক ১৩ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করে। এরপর ২০২২ সালে পাসের হার ছিল ৮৭ দশমিক ৫৩ শতাংশ, ২০২৩ সালে ৭৮ দশমিক ২৯ শতাংশ, ২০২৪ সালে ৮২ দশমিক ৮০ শতাংশ এবং ২০২৫ সালে ৭২ দশমিক ০৭ শতাংশ।
জানা গেছে, এবার জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০২৫ সালে ১১ হাজার ৮৪৩ জন, ২০২৪ সালে ১০ হাজার ৮২৩ জন, ২০২৩ সালে ১১ হাজার ৪৫০ জন, ২০২২ সালে ১৮ হাজার ৬৬৪ জন এবং ২০২১ সালে ১২ হাজার ৭৯৫ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছিল। সেখানে ২০২৬ সালে এ সংখ্যা নেমে এসেছে ৯ হাজার ৩৯৮ জনে।
শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ মনে করছেন, ইংরেজি ও গণিতসহ কয়েকটি বিষয়ে পাসের হার কমে যাওয়া এবং পাহাড়ি ও গ্রামীণ এলাকার বিদ্যালয়গুলোর আশানুরূপ ফল না হওয়ায় সামগ্রিক ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এবারের পরীক্ষায় তুলনামূলক কড়াকড়িও ফল বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ হতে পারে বলে তারা মনে করছেন।
বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, এবার মোট ১ লাখ ৩০ হাজার ২১৯ জন পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়। এর মধ্যে ২৮ হাজার ৭৭১ জন শুধু একটি বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছে, যা মোট পরীক্ষার্থীর ২২ দশমিক ০৯ শতাংশ। এক বিষয়ে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হওয়াও এবার সামগ্রিক পাসের হার কমার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এদিকে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে ৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থীই উত্তীর্ণ হতে পারেনি। বোর্ডের প্রকাশিত ‘জিরো পারসেন্টেজ স্কুল’ তালিকায় এসব প্রতিষ্ঠানের নাম উঠে এসেছে।
তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, শূন্য পাসের তালিকায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিভিন্ন দুর্গম এলাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
এসব প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষার্থী সংখ্যাও তুলনামূলকভাবে কম। তবে পরীক্ষার্থী কম হলেও একজনও পাস না করায় প্রতিষ্ঠানগুলোর পাঠদান, শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি, শিক্ষক সংকট ও অ্যাকাডেমিক তদারকি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তালিকা অনুযায়ী, ফটিকছড়ির নারায়ণহাট গার্লস হাইস্কুল থেকে মাত্র ৩ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেয়। তাদের কেউই পাস করতে পারেনি। ফলে প্রতিষ্ঠানটির পাসের হার দাঁড়িয়েছে শূন্য শতাংশে।
রাঙামাটি পার্বত্য জেলার বরকলের আন্দর মানিক (মাইছছড়ি) জুনিয়র হাইস্কুলে পরীক্ষার্থী ছিল ১০ জন। লংগদুর মোহালছড়ি হাইস্কুলে পরীক্ষার্থী ছিল ১৫ জন। এ দুটি প্রতিষ্ঠান থেকেও কোনো শিক্ষার্থী এসএসসিতে উত্তীর্ণ হয়নি।
এছাড়া সন্দ্বীপের উরিরচর জুনিয়র হাইস্কুল থেকে ১০ জন, খাগড়াছড়ির ভাইবোনছড়া গার্লস হাইস্কুল থেকে ১৭ জন এবং দীঘিনালার জারুলছড়ি হেডম্যান পাড়া হাইস্কুল থেকে ১৯ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেয়। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানের কোনো পরীক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি। দীঘিনালার তারাবানিয়া হাইস্কুল থেকে ৫ জন এবং বাঘাইছড়ির শিলজাক দজার বাজার জুনিয়র স্কুল থেকে ৫ জন পরীক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়। এই দুই প্রতিষ্ঠানেও পাসের হার শূন্য শতাংশ।
বোর্ডের তালিকায় থাকা আটটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরীক্ষার্থী ছিল জারুলছড়ি হেডম্যান পাড়া হাইস্কুলে ১৯ জন। এরপর ১৭ জন পরীক্ষার্থী ছিল ভাইবোনছড়া গার্লস হাইস্কুলে এবং ১৫ জন ছিল মোহালছড়ি হাইস্কুলে। এসব প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা খুব বেশি না হলেও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে ১৫ থেকে ১৯ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষা দিয়েও একজনও উত্তীর্ণ হতে পারেনি।
শিক্ষাবিদদের মতে, কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের শতভাগ শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হওয়ার পেছনে শুধু শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা দায়ী-এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। এর সঙ্গে শিক্ষক সংকট, নিয়মিত পাঠদান, দুর্গম এলাকায় শিক্ষার সুযোগ, শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া, অভিভাবকদের আর্থিক সক্ষমতা, বিদ্যালয়ের অবকাঠামো এবং শিক্ষা প্রশাসনের তদারকির বিষয়গুলোও জড়িত থাকতে পারে।
চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী আরো বলেন, ফলাফল বিশ্লেষণের মাধ্যমে কোন কোন প্রতিষ্ঠান ও বিষয়ে শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়েছে, তা চিহ্নিত করা হবে। শূন্য পাসের প্রতিষ্ঠানগুলোতে ফলাফল খারাপ হওয়ার কারণ খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় অ্যাকাডেমিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে।



